Home কৃষি রাকেশ টিকাইত সম্পর্কে দু-একটা কথা, যেটুকু জানা যায়

রাকেশ টিকাইত সম্পর্কে দু-একটা কথা, যেটুকু জানা যায়

রাকেশ টিকাইত সম্পর্কে দু-একটা কথা, যেটুকু জানা যায়
0

নকুল সিং সাহানি একজন স্বাধীন তথ্যচিত্র নির্মাতা। তাঁর কাজগুলির মধ্যে রয়েছে ২০১৩-র মুজফ্‌ফরনগরের দাঙ্গা নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘মুজফ্‌ফরনগর বাকি হ্যায়’। ওই দাঙ্গায় বিজেপির পক্ষে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন রাকেশ টিকাইতের ভাই নরেশ টিকাইত। বর্তমান কৃষক আন্দোলনে আবার নতুন করে উঠে এসেছেন রাকেশ। এই জাঠ কৃষক নেতার একবারের কান্নায় গোটা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের মধ্যে জোয়ার এসেছে। কেমন লোক এই রাকেশ। পশ্চিম উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে কোনো পট পরিবর্তন কি হচ্ছে? বিশ্লেষণ করলেন নকুল। raoit.in এ প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধটি আমরা ভাবানুবাদ করলাম।

গত কয়েক দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন পোস্ট চোখে পড়ছে, যেখানে মানুষ রাকেশ টিকাইতের সম্পর্কে নানা সন্দেহ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ করছে। এই ক্ষোভ মূলত ২০১৩ সালে মুজাফফরনগর ও শমলি জেলায় ঘটা দাঙ্গায় ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের (বিকিউ) দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকার কারণে।

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে ঘটা সেই ভয়াবহ ঘটনার সাড়ে সাত বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা দেখেছি বিকেইউ নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে অনেকগুলি নতুন সংগঠনের জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হ’ল বিকেইউ-র প্রধান মুসলিম নেতা এবং প্রয়াত বাবা টিকাইতের ডান হাত গোলাম মোহাম্মদ জৌলার সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া।

এদিকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অজিত সিং এবং জয়ন্ত চৌধুরী হেরে গেলে, এই অঞ্চলের বহু প্রবীণ জাঠেরা হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক জাঠ (বিশেষত প্রবীণ প্রজন্মের) ২০১৩-এর দাঙ্গায় লিপ্ত হওয়ার কারণে তাদের তরুণ প্রজন্মের কাজে মর্মাহত। আড়ালে, তারা প্রায়ই বলত, আশা করি আমাদের যুবকেরা তাদের ভুল বুঝতে খুব বেশি দেরি করবেনা।’

এর মানে এই নয় যে, এই সম্প্রদায়ের প্রবীণরা দাঙ্গায় জড়িত ছিল না। কিন্তু যারা বিকেইউ এবং আরএলডি-র উত্তাল দিনগুলি দেখেছিলেন তারা এই উন্মাদনার অর্থহীনতা বুঝতে পেরেছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিল যে অঞ্চলের মুসলমানরা তাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ (যদিও এই অঞ্চলের মুসলমানদের নিজেদের মধ্যেও জাতিগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। কিন্তু সেটি অন্য আলোচনার বিষয়)।

বিপিন সিং বালিয়ানের মতো স্থানীয় কিছু জাট নেতা হিন্দু-মুসলিম বিভেদ দূর করার জন্য যথা সম্ভব চেষ্টা করেছিলেন। এই ধরনের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় হলেও,  সে সময় পশ্চিম উত্তর প্রদেশ পরিণত হয়েছিল এমন এক ঘৃণা ও তিক্ততার মহাসাগরে, যাতে সেই প্রচেষ্টাগুলি ছিল নেহাতই একটি ছোট বিন্দুর সমান।

দাঙ্গার প্রায় পাঁচ বছর পর অবশেষে সেখানে ঠাকুর পূরণ সিং, গোলাম মোহাম্মদ জৌলা প্রমুখের নেতৃত্বে যৌথ হিন্দু-মুসলিম কিষাণ পঞ্চায়েত শুরু হয়।

অবশেষে, ২০১৯ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে, রাকেশ টিকাইতের নেতৃত্বে একটি বিশাল সমাবেশ হয়, যেটি ১০ দফা দাবি নিয়ে দিল্লিতে আসে। হিন্দু ও মুসলমান উভয় কৃষকই এই সমাবেশে অংশগ্রহণ করে। অন্যান্য অনেক ইউনিয়ন এই আন্দোলনে সমর্থন জানায়। দিল্লি শহর অবরুদ্ধ করে দেয় এই মিছিল। কিন্তু, সমস্ত দাবি পূরণ না হলেও, আন্দোলন হঠাৎ তুলে নেওয়া হয়। এতে অনেকেই মনে করে যে টিকাইতকে বিজেপি কিনে নিয়েছে।

২০১৯-এর পরে বিকেইউ-এর নেতৃত্বে মুজফফরনগর ও শমলি জেলায় অনেকগুলি প্রতিবাদ হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল প্রতিবাদ বিক্ষোভে প্রচুর মুসলিম কৃষকের উপস্থিতি। অনেকেই ছিলেন বিকেইউ-র পদাধীকারীও। এটা স্পষ্ট ছিল যে রাকেশ টিকাইট বিকেইউ-কে পুনরুদ্ধার করার জন্য কঠোর চেষ্টা করছিলেন। স্পষ্টতই নরেশ টিকাইতকে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়।

এমনকি ২০১৩ সালের মহাপঞ্চায়েতে, যেখানে বিজেপি পুরোপুরি বিকেইউ মঞ্চ হাইজ্যাক করে, সেখানে নরেশকেই বিজেপি নেতাদের সাথে মঞ্চে দেখা যায়। ২০১৩ সালের দাঙ্গার পরেও তিনি জ্বালাময়ী বক্তৃতা অব্যাহত রেখেছিলেন। গত ২-৩ বছর ধরে রাকেশ ইউনিয়নের লাগাম হাতে নিয়ে নরেশকে কোণঠাসা করে দিয়েছেন। এটি দুই ভাইয়ের মধ্যে আদর্শগত সংঘাত না কৌশলগত পদক্ষেপ, তা কেবল তারাই জানেন।

অবশেষে, কৃষক বিরোধী বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীরা দিল্লির সীমানায় পৌঁছলে, সবার নজর ছিল গাজিপুর সীমান্তে। পশ্চিম উত্তর প্রদেশ কেন একই তীব্রতা ও উদ্দীপনা নিয়ে এই প্রতিবাদে যোগ দিচ্ছে না, যেখানে তারা কৃষি আন্দোলনের জন্যে পরিচিত? সত্যি কথা বলতে গেলে, অনেক কৃষক এই আন্দোলনে যোগ দিতে খুব আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু রাকেশ টিকাইতের প্রতি তাদের আস্থার ব্যাপক ঘাটতি ছিল। অনেকেরই সন্দেহ ছিল যে তিনি বিজেপির এজেন্ট এবং যে কোনও মুহূর্তে পালটি খেতে পারেন।

তবে গাজিপুর সীমান্তে ২৭ জানুয়ারি রাতের ঘটনাগুলি সেই ধারণাটি বদলে দেয়। গাজিপুর সীমান্ত থেকে বিক্ষোভকারী কৃষকদের অপসারণের জন্য একটি বিশাল পুলিশ বাহিনী রওনা দেয়। একটি ভিডিও বার্তায় তিনি কাঁদছেন এমন অত্যন্ত আবেগময় আবেদনে রাকেশ টিকাইত পশ্চিম ইউপির কৃষকদের আলোড়িত করে তোলেন। তিনি তাঁর কথায়,  বিজেপিকে সমর্থন করার অপরাধবোধ এবং সেই সিদ্ধান্তের জন্য যে তিনি সর্বদা আফসোস করেন তা স্বীকার করেন। সেই রাতেই মুজফফরনগর জেলার সিসৌলি গ্রামে টিকাইতের বাড়ির বাইরে কয়েক হাজার লোক জড়ো হয়। এর দু’দিন পরে, ২২ জানুয়ারী সিসৌলি গ্রামে একটি ঐতিহাসিক মহাপঞ্চায়েত হয়। কয়েক হাজার লোক সেই পঞ্চায়েতে অংশগ্রহণ করে।

পঞ্চায়েতের মূল বক্তাদের মধ্যে ছিলেন গোলাম মোহাম্মদ জৌলা। তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘আপনারা এ পর্যন্ত দুটি সবচেয়ে বড়ো ভুল করেছেন, এক, আপনারা অজিত সিংকে হারিয়েছেন এবং দুই, মুসলমানদের হত্যা করেছেন’। এই কথা বলার সময় মহাপঞ্চায়েতের কেউ তাকে বাধা দেয়নি। চারদিকে ছিল গভীর নীরবতা। আন্তঃসমালোচনা। অন্যান্য বক্তারা বলেন, ‘আমরা আর কখনও বিজেপির ফাঁদে পা দেবো না’। ঐতিহাসিক পঞ্চায়েতে খুব বিরল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল- বিজেপিকে বয়কট করার। মহাপঞ্চায়েতদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনও রাজনৈতিক দলকে বয়কট করা বিরল ব্যাপার।

আজ যখন গাজিপুর সীমান্তে বাগপত, মুজাফফরনগর, শমলি, মীরাট ইত্যাদি জেলা থেকে কৃষকদের সহায়তার ভিত্তি বাড়ছে, একইরকম বক্তব্য প্রতিধ্বনিত হতে শুনবেন। ‘২০১৩ একটা বড় ভুল ছি’। ‘বিজেপি আমাদের রাগকে অপব্যবহার করেছে, এবং আমরা তার ফাঁদে পা দিয়েছি’। ‘বিজেপি এবং এসপি ২০১৩ সালের পরিস্থিতির জন্য দায়ী’। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, ২০১৩ সালে পশ্চিম উত্তর প্রদেশে বিজেপি বৃদ্ধি পায় মুজাফফরনগর দাঙ্গার কারণে, একই ভাবে মুজাফফরনগরে এর পতনও শুরু হবে ’। ১৯৮৮ সালে বোট ক্লাবের মধ্যে প্রতিধ্বনিত বিকেইউ-এর বিশিষ্ট স্লোগান, ‘হর হর মহাদেব, আল্লাহু আকবর’ শীঘ্রই ফিরে আসতে পারে।

এত সহজে কি অতীত মুছে যাবে?

এতে কি ২০১৩-র ক্ষতগুলি নিরাময় হবে?

আমি ২০১৩ সালের মুজাফফরনগর দাঙ্গা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছি এবং এই ঘটনার ফলে যে আঘাত, ধ্বংস এবং মেরুকরণ হয়েছে তা দেখেছি। আমার কাছে এর উত্তর নেই।

হয়তো। হয়তো না। সেই ৬০,০০০ মানুষ, মূলত মুসলমান, যারা বাস্তুহারা এবং তাদের জন্মের গ্রামে আর ফিরতে পারে না। ২০১৩ সালের দাঙ্গার জন্য দায়ী যারা, তারা কিন্তু এখন আফসোস করছে। তাদের ক্লিন চিট দেওয়া উচিত? এটি কি সমাধান? আমি জানি না। আমি এটুকুই জানি, যে ২০১৩ সালে দাঙ্গার কারণে পশ্চিম ইউপির প্রচুর ক্ষতি হয়েছে, যার ফল অনেকেই ভুগে চলেছেন। ২০১৩ না হলে, যোগী মুখ্যমন্ত্রীর পদ পেতেন কিনা সন্দেহ এবং মোদীও প্রধানমন্ত্রী হতেন না। আমার মতে পশ্চিম ইউপির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে পশ্চিম ইউপির অস্থির অংশগুলিতে নিরাময় ও কিছুটা শান্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অনেক এগিয়ে যাবে। এমনকি হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নতুন পথে চলবে। এতে সবকিছু পরিবর্তন হবে না। তবে এই জাতীয় প্রতিটি ছোটো এবং বড়ো পদক্ষেপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও এখনও অনেকেই রাকেশ টিকাইত সম্পর্কে আশঙ্কা করে চলেছেন এবং সম্ভবত তা ঠিকই, তবে আমি তাদের অনুরোধ করছি তারা যেন এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরেন। এটি একটি কঠিন সময়, এবং এই সময় এই জাতীয় আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি ভারতের যে ক্ষতি করেছে তা সংশোধন করতে অনেক বেশি সময় লাগবে। কখনও কখনও তা দ্বন্দ্ব পরিপূর্ণ হবে। কিন্তু হঠকারী প্রতিক্রিয়া কোন সাহায্য করবে না।

পশ্চিম ইউপিতে এখনও অনেকগুলি সমস্যা রয়েছে। পাঞ্জাবে জঙ্গি কৃষক ইউনিয়নগুলি বহু দশক ধরে সক্রিয় ছিল, হরিয়ানা এবং পশ্চিম ইউপি (বিকেইউ সহ) কৃষকদের একত্রিত করার জন্য খাপের উপর নির্ভর করে। সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব ভাঙতে সময় লাগবে। তবে ২০২১ সালের ২৯  জানুয়ারির মহাপঞ্চায়েত ছিল একটি নিশ্চিত, ক্ষুদ্র হলেও সমাজের গণতান্ত্রিকীকরণের দিকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।

Share Now:

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *